হিন্দু ধর্ম • Barishal Board • বরিশাল বোর্ড ২০২৪

হিন্দু ধর্ম প্রশ্ন

প্রত্যয় বাবু তার সন্তানদের লেখাপড়াসহ যাবতীয় খরচ বহন করেন। তাছাড়া অতিথি সেবা, মা-বাবার ভরণ-পোষণ, সমাজের প্রতি যে কর্তব্য তিনি তা নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। তার প্রতিবেশী সজল বাবুর ধারণা হলো, জাগতিক সকল কর্ম পরিত্যাগ করে কেবল ঈশ্বর চিন্তাতেই মগ্ন থাকা।ঈশ্বরের চিন্তায় মগ্ন থাকলেই কর্ম-ফলাসক্তি ও ভোগাসক্তি ত্যাগ হয়।

  1. ক)

    একেশ্বরবাদ কাকে বলে?

    (1)
  2. খ)

    প্রত্যাহার বলতে কী বোঝায়?

    (2)
  3. গ)

    প্রত্যয় বাবু কোন আশ্রমের অন্তর্ভুক্ত- তা পাঠের আলোকে বর্ণনা করো।

    (3)
  4. ঘ)

    “ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকলেই ভোগাসক্তি ও কর্ম-ফলাসক্তি ত্যাগ হয়”- সজল বাবুর ধারণা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।

    (4)

উত্তর ও ব্যাখ্যা

  1. ক)

    বেদ ও উপনিষদ অনুসারে ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়—এই বিশ্বাসকে একেশ্বরবাদ বলে।

  2. খ)

    প্রত্যাহার অর্থ ফিরিয়ে নেওয়া। বাহ্যিক বিষয়বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়সমূহকে ভিতরের দিকে ফিরিয়ে নেওয়াকে যোগে প্রত্যাহার বলে। এটি অষ্টাঙ্গ যোগের পঞ্চম ধাপ। দৃঢ়সংকল্প ও অভ্যাসের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলোকে অন্তর্মুখী করা যায়। ইন্দ্রিয় অন্তর্মুখী হলে চিত্তে বিষয়াসক্তি নষ্ট হয় এবং চিত্ত আরাধ্য বস্তুতে নিবিষ্ট হতে পারে।

  3. গ)

    প্রত্যয় বাবু গার্হস্থ্য আশ্রমের অন্তর্ভুক্ত।

    আশ্রমের ধারণা: হিন্দুধর্মে জীবনকে সার্থক ও গৌরবময় করার জন্য ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস—এই চারটি আশ্রমের কথা বলা হয়েছে। মানুষের শতবর্ষের জীবনকে চার ভাগ করা হয়, প্রতিটি ভাগ গড়ে পঁচিশ বছর। দ্বিতীয় পঁচিশ বছর গার্হস্থ্য আশ্রম। ব্রহ্মচর্য শেষে বিবাহ করে সংসারধর্ম পালনই গার্হস্থ্য আশ্রম। এ আশ্রমে সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণসহ প্রতিদিন পাঁচটি যজ্ঞ করতে হয়—

    ১. পিতৃযজ্ঞ: মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সেবা-যত্ন।
    ২. দেবযজ্ঞ: প্রকৃতিদত্ত বস্তু ভোগের সময় কৃতজ্ঞচিত্তে ভগবানকে নিবেদন।
    ৩. ভূতযজ্ঞ: পাখিসহ অন্যান্য জীবজন্তুকে আহার প্রদান ও পরিচর্যা।
    ৪. নৃযজ্ঞ: অতিথি সেবা।
    ৫. ঋষিযজ্ঞ: বেদসহ প্রয়োজনীয় গ্রন্থ পাঠ করে জ্ঞান ও নৈতিকতা অর্জন।

    এছাড়া মঠ, মন্দির, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয় ইত্যাদি স্থাপনের মাধ্যমে সমাজের প্রতি কর্তব্য পালনও এই আশ্রমের কর্ম।

    উদ্দীপকের সঙ্গে সম্পর্ক: প্রত্যয় বাবু সন্তানদের লেখাপড়াসহ যাবতীয় খরচ বহন করেন, অতিথি সেবা (নৃযজ্ঞ) করেন, মা-বাবার ভরণ-পোষণ (পিতৃযজ্ঞ) করেন এবং সমাজের প্রতি কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। এসব গার্হস্থ্য আশ্রমের কর্মের সঙ্গে মিলে যায়।

    অতএব, প্রত্যয় বাবু গার্হস্থ্য আশ্রমের অন্তর্ভুক্ত।

  4. ঘ)

    সজল বাবুর ধারণা, জাগতিক সব কর্ম ত্যাগ করে কেবল ঈশ্বরচিন্তায় মগ্ন থাকলেই ভোগাসক্তি ও কর্মফলাসক্তি ত্যাগ হয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আলোকে এ ধারণা যথার্থ নয়।

    গীতার কর্মযোগ: মানুষকে জীবনধারণের জন্য কর্ম করতেই হয়। তবে আবশ্যিক কর্মের মাধ্যমে মুক্তি মেলে না; কর্মকে যোগে বা নিষ্কাম কর্মে পরিণত করতে হয়। ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জিত এই কর্মই কর্মযোগ। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন। মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি॥' (২/৪৭)।

    ১. ফলাসক্তি ত্যাগ করতে বলা হয়েছে, কর্ম নয়: শ্লোকের অর্থ—কর্মে তোমার অধিকার, ফলে কখনো নয়; ফলাসক্তি ত্যাগ করো, কিন্তু কর্ম ত্যাজ্য নয়। কর্মফল যেন কর্মের হেতু না হয় এবং কর্মত্যাগেও যেন প্রবৃত্তি না হয়। সজল বাবু সকল কর্ম পরিত্যাগ করতে চান, যা গীতার নির্দেশের বিপরীত।

    ২. কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ: কর্মযোগের নির্দেশ হলো কর্মকর্তা কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করবেন, 'আমি কর্ম করছি' এই অভিমান রাখবেন না এবং প্রত্যেকে নিজ কর্ম অবশ্যই সম্পন্ন করবেন। এভাবে কর্ম করলে কর্মকর্তা অনাবিল আনন্দ লাভ করেন। অর্থাৎ আসক্তি ত্যাগের উপায় কর্মের মধ্যে থেকেই নিষ্কাম ভাব অর্জন।

    ৩. প্রত্যয় বাবুর দৃষ্টান্ত: প্রত্যয় বাবু সংসারের সব কর্তব্য পালন করে গার্হস্থ্য আশ্রমের আদর্শ অনুসরণ করছেন। কলিযুগে গার্হস্থ্য আশ্রমে থেকেই জীবনযাপন করা ভালো, কারণ এ যুগে স্ত্রী-পুত্র, মা-বাবাকে পরিত্যাগ করে বানপ্রস্থ বা সন্ন্যাস গ্রহণে উৎসাহিত করা হয় না।

    ৪. ঈশ্বরচিন্তার স্থান: ঈশ্বরচিন্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; ঈশ্বরে কর্মফল অর্পণ ও ভক্তি আসক্তি দূর করতে সাহায্য করে। তবে তা কর্তব্য ত্যাগের বিনিময়ে নয়, কর্তব্য পালনের সঙ্গেই হতে হবে।

    অতএব, ঈশ্বরচিন্তা ভোগাসক্তি ও কর্মফলাসক্তি ত্যাগে সহায়ক হলেও কর্ম পরিত্যাগ করে নয়, নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমেই তা সম্ভব। তাই সজল বাবুর ধারণা গীতার শিক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়।

আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও

সম্পর্কিত প্রশ্ন