বাংলা ২য় পত্র • Barishal Board • বরিশাল বোর্ড ২০২৩
বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন
নিচের যেকোনো একটি বিষয়ে অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো:
12.1.
ক. শুদ্ধাচার
12.2.
খ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম
12.3.
গ. বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প
12.4.
ঘ. চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান
12.5.
ঙ. বৈশ্বিক মহামারি: বাংলাদেশ।
উত্তর ও ব্যাখ্যা
AI-লিখিত অনুমানভিত্তিক উত্তর—ধারণা ও সীমাবদ্ধতা নিচে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি উৎসের যাচাইকৃত মূল উত্তর হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না।
স্পষ্ট অনুমান: এইচএসসি বাংলা ২য় পত্রের ১২ নং প্রশ্নের মান ২০ নম্বর ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ ও পরিমিত ব্যাপ্তির প্রবন্ধ রচনা প্রস্তুত করা হয়েছে। | প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত ৫টি বিষয়ের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে 'খ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম' বিষয়টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম
ভূমিকা:
দেশপ্রেম মানুষের অন্তরের এক মহত্তম ও চিরন্তন অনুভূতি। স্বদেশের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই দেশপ্রেম। আর বাঙালি জাতির ইতিহাসে দেশপ্রেমের সবচেয়ে উজ্জ্বল, ত্যাগদীপ্ত ও গৌরবময় প্রকাশ ঘটেছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার সশস্ত্র লড়াই ছিল না; তা ছিল একটি শোষণহীন, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। স্বদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই বাঙালি জাতি সেদিন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য।
দেশপ্রেমের স্বরূপ ও তাৎপর্য:
দেশপ্রেম মানবচরিত্রের এক পরম ভূষণ। প্রাচীন প্রবাদে বলা হয়েছে—"জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী", অর্থাৎ জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। দেশের সার্বিক মঙ্গল ও আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করার মানসিকতাই প্রকৃত দেশপ্রেম। দেশের প্রতি কর্তব্যহীন মানুষের তীব্র সমালোচনা করে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত যথার্থই বলেছেন:
"স্বদেশের উপকারে নাই যার মন
কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন।"
দেশপ্রেম মানুষকে ক্ষুদ্র স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে তুলে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে শামিল করে।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরাধীন করে রাখে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার চেতনা ক্রমশ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার রূপ লাভ করে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন—"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।" ২৫শে মার্চের কালরাতে নিরীহ বাঙালির ওপর বর্বরোচিত গণহত্যার পর শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং দুই লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় পরম কাঙ্ক্ষিত বিজয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল উপাদান:
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঙালি জাতির আদর্শিক দিকদর্শন। এর মূল স্তম্ভগুলো হলো—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র (শোষণহীন সমাজ) এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। এর অন্তর্নিহিত ভাবধারাসমূহ হলো:
১. বৈষম্যহীন সমাজ গঠন: ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যমুক্ত একটি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
২. অসাম্প্রদায়িকতা: ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব নিশ্চিত করা।
৩. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ: জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা।
৪. মানবিক মর্যাদা: প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেমের মেলবন্ধন:
দেশপ্রেম ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ সম্ভব ছিল না, আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাদ দিলে আধুনিক বাংলাদেশের দেশপ্রেম অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৭১ সালে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী—সকলেই নিজ নিজ স্বার্থ ভুলে দেশকে শত্রুমুক্ত করার একই ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। স্বদেশপ্রেমের এই চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তি স্থাপন করেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়:
"সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে,
সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে।"
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব:
আজ বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্তির পথে অনেকটাই অগ্রসর হলেও সমাজে দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব ও নানা অপশক্তির অপতৎপরতা বিদ্যমান। বর্তমান প্রজন্মের দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটবে নতুন আঙ্গিকে—সততা, নিষ্ঠা, মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করার মাধ্যমে। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাস জানতে হবে, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করতে হবে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে জ্ঞানভিত্তিক স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে হবে।
উপসংহার:
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায় এবং জাতীয় জীবনের প্রেরণার চিরন্তন আলোকবর্তিকা। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও