হিন্দু ধর্ম • Dinajpur Board • দিনাজপুর বোর্ড ২০২৩
হিন্দু ধর্ম প্রশ্ন
প্রথমার বাবা প্রথমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র খুঁজছেন। একবার 'ক' নামক এক ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথা প্রায় শেষ পর্যায়ে এসেছিল। এমন সময় পাত্রপক্ষ প্রথমার বাবার কাছে একটি প্রাইভেট কার দাবি করে। প্রথমার বাবা একথা শোনার সাথে সাথেই বলেন- 'এমন ছোট মনের মানুষের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।'- যদিও একটা প্রাইভেট কার দেওয়ার মতো যথেষ্ট সামর্থ্য প্রথমার বাবার ছিল। তাছাড়া বিষয়টি তার কাছে অসম্মানজনক কাজ বলে মনে হয়।
- ক)(1)
বর্তমান সমাজে কোন বিবাহ অধিক প্রচলিত?
- খ)(2)
বিবাহের মূল পর্ব সম্পর্কে বুঝিয়ে লেখো।
- গ)(3)
'ক' নামক পাত্রের সাথে প্রথমার বিয়ে না দেওয়ার কারণ পাঠ্যের আলোকে ব্যাখ্যা করো।
- ঘ)(4)
পাঠের আলোকে প্রথমার বাবার কাজটির যৌক্তিকতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা
- ক)
বর্তমান সমাজে ব্রাহ্মবিবাহ অধিক প্রচলিত।
- খ)
হিন্দু বিবাহের মূল পর্ব হলো সম্প্রদান। এই পর্বে বর-কনেকে নির্দিষ্ট পোশাক পরিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে মুখোমুখি বসানো হয়; বর থাকে পূর্বমুখী, কনে পশ্চিমমুখী এবং কন্যা সম্প্রদানকারী উত্তরমুখী। পুতলি অঙ্কিত, আম্রপল্লবে সুশোভিত, গঙ্গাজলপূর্ণ ঘটের ওপর বরের চিৎ করা ডান হাতের ওপর কনের ডান হাত রাখা হয়। তার ওপর পাঁচটি ফল, কুশপত্র ও ফুলের মালা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর সম্প্রদানকর্তা দেবতাদের নাম উচ্চারণ করে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির মধ্যে কন্যা সম্প্রদান করেন।
- গ)
প্রথমার বাবা 'ক' নামক পাত্রের সঙ্গে প্রথমার বিয়ে দেননি, কারণ পাত্রপক্ষ একটি প্রাইভেট কার দাবি করেছিল, যা পণপ্রথা বা যৌতুকপ্রথার অন্তর্ভুক্ত।
পাঠ্যের ধারণা: কন্যাকে পাত্রস্থ করার সময় বরপক্ষকে যদি নগদ অর্থ, সম্পদ প্রভৃতি দিতে হয়, তাহলে তাকে পণ বলে। হিন্দুধর্মের পাঠ্যবইয়ে একে 'পণপ্রথা অধর্ম' বলা হয়েছে। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি, যা বহুকাল ধরে সমাজের ক্ষতি করছে। পণ গ্রহণ ও প্রদান দুটোই সমান অপরাধ। এর মূলে রয়েছে অশিক্ষা, অসচেতনতা এবং পিতৃতান্ত্রিক ও পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এটি নিষিদ্ধ।
উদ্দীপকের সঙ্গে সম্পর্ক: উদ্দীপকে বিয়ের কথা প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার মুহূর্তে 'ক' নামক পাত্রের পক্ষ একটি প্রাইভেট কারের দাবি জানায়। এটি সরাসরি যৌতুক দাবি। প্রথমার বাবা এই দাবি শুনেই ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, 'এমন ছোট মনের মানুষের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।' গাড়ি দেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি এটিকে অসম্মানজনক মনে করেছেন। কারণ তিনি জানেন, পণ গ্রহণ ও দান দুটোই অন্যায়।
অতএব, যৌতুক দাবির মতো অধর্ম ও অসম্মানজনক শর্তের কারণেই প্রথমার বাবা 'ক'-এর সঙ্গে বিয়ে দেননি।
- ঘ)
পাঠের আলোকে প্রথমার বাবার কাজটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও প্রশংসনীয়। যৌতুকের দাবিতে তিনি মেয়ের বিয়ে ভেঙে দিয়ে একটি অধর্মকে প্রশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছেন।
হিন্দুধর্মে বিবাহ কোনো চুক্তি নয়, বরং জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কার। এখানে নারী পুরুষের সহধর্মিণী এবং স্ত্রীকে বাদ দিয়ে পুরুষের কোনো ধর্মকার্যই সম্পন্ন হয় না। এ পবিত্র সংস্কারে অর্থ বা সম্পদের দাবির কোনো স্থান নেই।
১. ধর্মীয় দিক থেকে যৌক্তিকতা: পাঠ্যবইয়ে পণপ্রথাকে অধর্ম বলা হয়েছে। বিবাহের শ্রেষ্ঠ মন্ত্র 'যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম' অর্থাৎ তোমার হৃদয় আমার হোক, আমার হৃদয় তোমার হোক। এই মন্ত্রে হৃদয়ের মিলনের কথা বলা হয়েছে, কোনো পণ বা উপহারের কথা নয়। কাজেই যৌতুকের দাবি বিবাহের মূল আদর্শের পরিপন্থী।
২. সামাজিক ও আইনি দিক থেকে যৌক্তিকতা: যৌতুকপ্রথা একটি সামাজিক ব্যাধি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। পণ নেওয়া ও দেওয়া সমান অপরাধ। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রথমার বাবা যদি দাবি মেনে নিতেন, তবে তিনি অপরাধ ও কুপ্রথাকে সমর্থন করতেন এবং সমাজে এ প্রথা আরও বদ্ধমূল হতো।
৩. নারীর মর্যাদা রক্ষার দিক থেকে যৌক্তিকতা: যে পরিবার বিয়ের আগেই কন্যাকে পণ্যের মতো দেখে, সেখানে মেয়ের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া পণপ্রথা নির্মূলের অন্যতম উপায় বলে পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ আছে। প্রথমার বাবা এভাবে কন্যার মর্যাদাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
৪. সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন: পণপ্রথা নির্মূলে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। তাঁর এই দৃঢ় অবস্থান অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।সুতরাং, ধর্মীয় অনুশাসন, আইন ও নারীর মর্যাদার বিবেচনায় প্রথমার বাবার সিদ্ধান্ত যথার্থ ও যুক্তিসংগত।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও