বাংলা ২য় পত্র • Sylhet Board • সিলেট বোর্ড ২০১৭
বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন
1.
বাংলাদেশের উৎসব।
উত্তর ও ব্যাখ্যা
AI-তৈরি নমুনা উত্তর
বাংলাদেশের উৎসব
ভূমিকা:
'বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ'—এ চিরন্তন প্রবাদ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় বাঙালি জাতির উৎসবপ্রিয়তা। উৎসব মানুষের জীবনকে করে তোলে বৈচিত্র্যময়, আনন্দঘন ও সতেজ। কর্মব্যস্ত ও একঘেয়ে জীবনের ক্লান্তি দূর করে উৎসব বয়ে আনে পারস্পরিক মিলন ও সম্প্রীতির বার্তা। বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে নানা উৎসবে মেতে ওঠে।
উৎসবের শ্রেণিবিভাগ:
বাংলাদেশের উৎসবসমূহকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. ধর্মীয় উৎসব
২. জাতীয় ও ঐতিহাসিক উৎসব
৩. সামাজিক ও লোকজ উৎসব
৪. ঋতুভিত্তিক ও কৃষিজ উৎসব।
ধর্মীয় উৎসবসমূহ:
বাংলাদেশের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো সর্বজনীন সম্প্রীতির রূপ ধারণ করে।
- মুসলমানদের উৎসব: মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ত্যাগ, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা নিয়ে আসে এই ঈদ। এছাড়া শবে বরাত, শবে কদর, ঈদে মিলাদুন্নবী এবং মহররম ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে উদযাপিত হয়।
- হিন্দুদের উৎসব: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। ঢাকের বাদ্য আর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই উৎসবে সব ধর্মের মানুষ শুভেচ্ছা বিনিময় করে। এছাড়া লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতীপূজা, জন্মাষ্টমী ও শ্যামাপূজা বিপুল উৎসাহে পালিত হয়।
- বৌদ্ধদের উৎসব: বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব বুদ্ধপূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দান। শান্তি ও অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দেয় এ উৎসব।
- খ্রিস্টানদের উৎসব: খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব বড়দিন বা ক্রিসমাস। যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে আলোকসজ্জা, কেক কাটা ও প্রার্থনার মাধ্যমে এই দিনটি পালিত হয়।
জাতীয় ও ঐতিহাসিক উৎসব:
জাতীয় জীবনে চেতনা ও আত্মমর্যাদার স্মারক হিসেবে পালিত হয় জাতীয় দিবসগুলো।
- ২১শে ফেব্রুয়ারি (শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস): ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রভাতফেরি ও রক্তিম ফুলের অর্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে এটি পালিত হয়।
- ২৬শে মার্চ (মহান স্বাধীনতা দিবস): বাঙালি জাতির মুক্তির শপথ নবায়নের দিন।
- ১৬ই ডিসেম্বর (মহান বিজয় দিবস): পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের গৌরবময় দিন।
সামাজিক ও লোকজ উৎসব:
- পহেলা বৈশাখ (বাংলা নববর্ষ): এটি বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক জাতীয় উৎসব। রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা এবং পান্তা-ইলিশের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো জাতি নববর্ষকে বরণ করে নেয়।
- নবান্ন উৎসব: হেমন্তে নতুন ধান কাটার পর গ্রামে গ্রামে নবান্ন উৎসবের ঢল নামে। নতুন ধানের চাল দিয়ে পায়েস, পিঠাপুলি তৈরির ধূম পড়ে।
- পৌষমেলা ও পিঠাপুলি উৎসব: শীতকালে গ্রাম ও শহরে নানা ধরনের পিঠামেলা অনুষ্ঠিত হয়।
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব: পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাদের বৈসাবি উৎসব এবং গারোদের ওয়ানগালা উৎসব আমাদের সংস্কৃতিকে বর্ণিল করে তুলেছে।
সামাজিক সম্প্রীতি ও তাৎপর্য:
উৎসবের মূল সুর হলো মিলন। বাংলাদেশের উৎসবের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনা। 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার'—এ চেতনাতেই যুগ যুগ ধরে বাংলার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসব উদযাপন করে আসছে। উৎসবের মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায় এবং নতুন প্রজন্ম তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের উৎসবগুলো আমাদের আত্মপরিচয় ও ঐক্যের প্রতীক। আধুনিকতার স্পর্শে নগরজীবনে উৎসব উদযাপনের ধরনে কিছু পরিবর্তন এলেও এর মূল চেতনা আজও অমলিন। ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি মানবিক সমাজ গঠনে এই উৎসবগুলো চিরকাল প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও