বাংলা ২য় পত্র • Sylhet Board • সিলেট বোর্ড ২০২৫

বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন

5.

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

উত্তর ও ব্যাখ্যা

AI-তৈরি নমুনা উত্তর

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ভূমিকা:
ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য রক্ত দেওয়ার এক অনন্য ইতিহাস রয়েছে বাঙালি জাতির। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রক্তিম ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা আজ ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বমঞ্চে। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। এটি বাঙালি জাতির জন্য এক পরম গৌরব ও মর্যাদার দিন।

পটভূমি ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ওপর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে পূর্ব বাংলা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৮) ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এলে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে শহীদ হন। এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের ফলেই অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। ভাষার জন্য এই আত্মদান ছিল বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ও অভূতপূর্ব।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি:
২১শে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কানাডাপ্রবাসী কিছু উদ্যোগী বাঙালি (বিশেষত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম) এবং 'মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড' সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (UNESCO) ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ দিবসটিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।

দিবসটির মূল চেতনা ও তাৎপর্য:
১. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ: বিশ্বে প্রায় সাত হাজার ভাষা প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে বহু ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। দিবসটি এসব ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর ভাষা সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করে।
২. মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা: সব মাতৃভাষাকে সমান সম্মান প্রদান এবং অন্য ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য রক্ষা করাই এ দিবসের মূল বাণী।
৩. বৈষম্য ও ভাষা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: যেকোনো ধরনের ভাষিক আধিপত্য ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এটি এক বলিষ্ঠ বার্তা।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপন:
বাংলাদেশে মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা হয়। প্রভাতফেরিতে কণ্ঠে বাজে অমর গান—'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি'। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে নিজ নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা তুলে ধরে।

আমাদের দায়িত্ব ও করণীয়:
১. সর্বত্র বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার ও প্রমিত রূপের চর্চা নিশ্চিত করা।
২. উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, চিকিৎসা ও বিচার বিভাগে বাংলা ভাষার সর্বজনীন প্রয়োগ বৃদ্ধি করা।
৩. বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা এবং তাদের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ সুনিশ্চিত করা।

উপসংহার:
২১শে ফেব্রুয়ারি আজ কেবল বাঙালির একার শোক ও গর্বের দিন নয়; এটি বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মায়ের ভাষাকে ভালোবাসা ও সংরক্ষণের এক সার্বজনীন প্রেরণা। ভাষার মর্যাদা রক্ষার এই চেতনা বিশ্বজুড়ে বৈচিত্র্য ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিক—এটাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চিরন্তন অঙ্গীকার।

আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও

সম্পর্কিত প্রশ্ন