বাংলা ২য় পত্র • Barishal Board • বরিশাল বোর্ড ২০২৫
বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন
3.
একুশের চেতনা
উত্তর ও ব্যাখ্যা
AI-তৈরি নমুনা উত্তর
একুশের চেতনা
ভূমিকা:
বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের চিরন্তন উৎস হলো 'একুশের চেতনা'। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষা করেছিল। এই রক্তস্নাত আত্মত্যাগ কেবল ভাষার অধিকারেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা রূপ নিয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার, স্বাতন্ত্র্য ও মুক্তির মূলমন্ত্রে। একুশের চেতনা হলো অন্যায়, অবিচার, শোষণ এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার অবিনাশী প্রেরণা।
একুশের ঐতিহাসিক পটভূমি:
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করে। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাঙালি ছাত্র-জনতা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে শহীদ হন। এই ঐতিহাসিক আত্মদানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষার মর্যাদা।
একুশের চেতনা কী:
একুশের চেতনা কেবল শোক প্রকাশের বিষয় নয়, এটি বাঙালির চিরন্তন শক্তি ও প্রেরণার নাম। একুশের চেতনার মূল উপাদান হলো:
১. মাতৃভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা: নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানানো এবং মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা।
২. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধ: কোনো ধরনের নিপীড়ন বা বৈষম্য মেনে না নিয়ে ন্যায়ের পক্ষে সোচ্চার হওয়া।
৩. অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনা: ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সম-অধিকার ও মুক্ত চিন্তার বিকাশ নিশ্চিত করা।
জাতীয় জীবনে একুশের প্রভাব:
একুশের রক্তঝরা পথ ধরেই সূচনা হয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতার মহাকাব্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে এসেছে ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলনের সেই চেতনার আলোকেই অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একুশ:
একুশের চেতনা এখন আর কেবল বাংলাদেশের সীমানায় আবদ্ধ নেই। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে বাঙালির এই আত্মত্যাগের মহিমা সারা বিশ্বের সকল বিলুপ্তপ্রায় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাকে সংরক্ষণের বিশ্বজনীন প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়:
আজকের প্রেক্ষাপটে একুশের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ হলো সমাজের সকল অন্যায়, বৈষম্য, দুর্নীতি ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। সর্বত্র শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির যুগে বাংলাকে সমৃদ্ধ করা আমাদের দায়িত্ব। একই সাথে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাই একুশের প্রকৃত শিক্ষা।
উপসংহার:
একুশ আমাদের অহংকার, একুশ আমাদের অস্তিত্ব। রক্তে লেখা একুশের অবিনাশী চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে গিয়ে বাঙালিকে সকল সঙ্কট ও দুর্যোগে আলোর পথ দেখায়। একুশের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করে একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও প্রগতিশীল দেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও