বাংলা ২য় পত্র • Cumilla Board • কুমিল্লা বোর্ড ২০২৩

বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন

যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করো:

12.1.

ক. বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পদ্মাসেতুর অবদান

12.2.

খ. আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ও বাংলাদেশ

12.3.

গ. বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

12.4.

ঘ. মাদকাসক্তি ও তরুণ সমাজ

12.5.

ঙ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশ।

উত্তর ও ব্যাখ্যা

AI-তৈরি নমুনা উত্তর

ক. বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পদ্মাসেতুর অবদান

ভূমিকা:
পদ্মাসেতু বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, আত্মপ্রত্যয় এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক অনন্য স্মারক। খরস্রোতা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত এই বহুমুখী সেতু শুধু রাজধানী ঢাকার সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সংযোগ ঘটিয়েছে তা নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে এক বৈপ্লবিক দিগন্তের উন্মোচন করেছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই স্বপ্নসেতু আজ বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

পদ্মাসেতুর পটভূমি ও নির্মাণ:
পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউ ও নদীভাঙনের কারণে বহু বছর ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাত। বহুল প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংক্রান্ত নানা জটিলতার সৃষ্টি হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং দীর্ঘ প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০২২ সালের ২৫ জুন এই ঐতিহাসিক সেতু উদ্বোধন করা হয়। এটি ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি দ্বিতলবিশিষ্ট বহুমুখী সেতু, যার উপরিভাগে চার লেনের সড়ক এবং নিম্নভাগে রেলপথ রয়েছে।

যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন:
পদ্মাসেতু চালুর আগে ফেরি পারাপারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি কখনো কখনো দিন পার হয়ে যেত। পদ্মাসেতু চালুর ফলে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে পৌঁছাতে সময় নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এখন খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী বা বাগেরহাট থেকে ঢাকায় যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে। এই সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।

কৃষি ও মৎস্যখাতে প্রভাব:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বাংলাদেশের খাদ্যভান্ডার ও মৎস্য সম্পদের উর্বর ক্ষেত্র বলা যায়। পদ্মা পারাপারের জটিলতায় অতীতে কৃষিপণ্য ও টাটকা মাছ সময়মতো রাজধানীতে পৌঁছাতে না পারায় পচে যেত বা নষ্ট হতো, ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেতেন না। পদ্মাসেতু উন্মুক্ত হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের পণ্য রাজধানীর বাজারসহ সারা দেশে পাঠাতে পারছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমেছে এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পেয়ে লাভবান হচ্ছেন।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি:
পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ব্যাপক শিল্পায়নের সূচনা হয়েছে। ভাঙ্গা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল এবং খুলনায় ইতোমধ্যে নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রপ্তানিমুখী কারখানা, পাটকল ও কোল্ড স্টোরেজ গড়ে উঠছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) এবং হাইটেক পার্ক স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। শিল্পায়নের এই জোয়ারে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, যা বেকারত্ব দূরীকরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

পর্যটনশিল্পের বিকাশ:
পদ্মাসেতুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনখাত এক নতুন রূপ পেয়েছে। সুন্দরবন, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিসৌধে পর্যটকদের যাতায়াত বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কুয়াকাটায় এখন ঢাকা থেকে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টায় পৌঁছানো সম্ভব। এতে হোটেল, মোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে।

মোংলা ও পায়রা বন্দরের গতিশীলতা:
পদ্মাসেতু দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা এবং নবনির্মিত পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে এই দুই বন্দর এখন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এছাড়া ভোমরা ও বেনাপোল স্থলবন্দরের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ভারতের সাথে আমদানি-রপ্তানি পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি ও জিডিপিতে অবদান:
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মাসেতু দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে বার্ষিক ১.২ থেকে ১.৫ শতাংশ অতিরিক্ত অবদান রাখতে সক্ষম। এছাড়া শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আঞ্চলিক জিডিপিতে এর প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশের বেশি। পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্প সম্পূর্ণরূপে চালু হলে এবং এর সাথে এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে যুক্ত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।

উপসংহার:
পদ্মাসেতু কেবল একটি ইস্পাত-কংক্রিটের কাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক। এই সেতু আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে এক সমন্বিত ও সুষম অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করেছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ 'স্মার্ট বাংলাদেশ'-এ রূপান্তরের যে রূপকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, পদ্মাসেতু সেই অগ্রযাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলবে।

আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও

সম্পর্কিত প্রশ্ন