বাংলা ২য় পত্র • Rajshahi Board • রাজশাহী বোর্ড ২০১৬

বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন

4.

অমর একুশের বই মেলা।

উত্তর ও ব্যাখ্যা

AI-তৈরি নমুনা উত্তর

অমর একুশের বইমেলা

ভূমিকা:
বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার এক অনন্য মিলনমেলা হলো 'অমর একুশে বইমেলা'। এটি কেবল সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক পুস্তক প্রদর্শনী নয়; এটি আমাদের ভাষা আন্দোলন, আত্মত্যাগ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার প্রতীক। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এই বইমেলা বাঙালি জাতির মনন ও সংস্কৃতির দর্পণ হিসেবে কাজ করে।

বইমেলার পটভূমি ও ইতিহাস:
অমর একুশে বইমেলার ইতিহাস বাঙালি জাতির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িত। দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের মুখের ভাষা ও সাহিত্যের ওপর আঘাত হানে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখের আত্মত্যাগে প্রতিষ্ঠিত হয় মাতৃভাষার মর্যাদা। এই অমর শহীদদের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতেই বইমেলার সূচনা। ১৯৭২ সালে মুক্তধারা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বটতলায় চটের ওপর মাত্র ৩২টি বই সাজিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বইমেলার ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার সাথে যুক্ত হয় এবং ১৯৮৪ সালে মেলাটির নামকরণ করা হয় 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা'।

মেলার স্বরূপ ও বিস্তার:
শুরুতে বাংলা একাডেমির ক্ষুদ্র চত্বরে মেলাটি সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সাথে সাথে এর পরিসর বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলা একাডেমির মূল প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সংলগ্ন ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার প্রধান অংশ বিস্তৃত হয়েছে। মেলায় সৃজনশীল সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, শিশুসাহিত্য থেকে শুরু করে গবেষণামূলক হাজার হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়। মেলার মূল আকর্ষণ থাকে 'শিশুপ্রহর', লিটল ম্যাগাজিন চত্বর এবং বাংলা একাডেমির আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বাঙালির মননশীলতায় বইমেলার ভূমিকা:
অমর একুশের বইমেলা বাঙালির রুচি ও সাহিত্যবোধ বিকাশে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে এক নিবিড় মেলবন্ধন তৈরি হয় এই মেলায়। প্রবীণ সাহিত্যিকদের পাশাপাশি নবীন লেখকদের আত্মপ্রকাশের এটি প্রধান মঞ্চ। বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বইমেলা মানুষকে বই পড়ার প্রতি নতুন করে আকৃষ্ট করতে এবং বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

জাতীয় জীবনে একুশের বইমেলার তাৎপর্য:
বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়, এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার মিলনক্ষেত্র। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সারা দেশের মানুষ ফেব্রুয়ারি মাসে এই মেলায় এসে সমবেত হয়। ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছিল, অমর একুশে বইমেলা সেই চেতনাকে প্রতি বছর নতুন করে জাগ্রত করে। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করে।

বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের উপায়:
বর্তমানে বইমেলার কলেবর বাড়লেও মানসম্মত বইয়ের ঘাটতি, অপরিকল্পিত প্রকাশনা এবং পাইরেসির মতো কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পাঠকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রকাশকদের উচিত লেখার গুণগত মান যাচাই করে মানসম্পন্ন ও তথ্যবহুল বই প্রকাশে যত্নশীল হওয়া।

উপসংহার:
অমর একুশের বইমেলা আমাদের অহংকার ও প্রাণের উৎসব। এটি বাঙালি আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে হলে জ্ঞানভিত্তিক ও মননশীল সমাজ গঠনের কোনো বিকল্প নেই। বইমেলার ইতিবাচক চেতনা ও বই পড়ার সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও

সম্পর্কিত প্রশ্ন