হিন্দু ধর্ম • Mymensingh Board • ময়মনসিংহ বোর্ড ২০২৩
হিন্দু ধর্ম প্রশ্ন
সুকুমার বাবু সাংসারিক কাজের পাশাপাশি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। তিনি ফলের আশা না করেই সমস্ত কাজ করেন। কর্মফল ঈশ্বরের চরণে নিবেদন করেন। অন্যদিকে, তার বন্ধু সুকোমল বাবু গৃহে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপন করে সকাল সন্ধ্যা ভক্তিভরে ডাকেন। তিনি সবকিছুর মধ্যে ভগবানকে অনুভব করেন। সুকোমল বাবু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, ভগবান করুণা করলে তবেই আমাদের মুক্তি।
- ক)(1)
ধারণা কাকে বলে?
- খ)(2)
যোগসাধনার সর্বোচ্চ স্তরটি ব্যাখ্যা করো।
- গ)(3)
সুকুমার বাবুর কর্মকান্ডে কোন সাধন পথ প্রতিফলিত হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
- ঘ)(4)
সুকোমল বাবুর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মোক্ষপ্রাপ্তি সম্ভব।'- পাঠের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা
- ক)
মনকে বিশেষ কোনো বিষয়ে স্থির করা বা আবদ্ধ রাখার নামই ধারণা।
- খ)
যোগসাধনার (অষ্টাঙ্গ যোগের) সর্বোচ্চ স্তর হলো সমাধি। সমাধি অর্থ সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরে চিত্তসমর্পণ। ধ্যানের অত্যুচ্চ শিখরে উঠে সাধক সমাধি লাভ করেন। তখন তিনি মনশূন্য, বুদ্ধিশূন্য ও অহংশূন্য অবস্থা প্রাপ্ত হন এবং পরমাত্মার মধ্যে জীবাত্মার নিবেশ ঘটে। এ অবস্থায় সাধকের 'আমি' বা 'আমার' জ্ঞান থাকে না, তাঁর অন্বেষণের শেষ হয় এবং তিনি প্রকৃত যোগ লাভ করেন।
- গ)
সুকুমার বাবুর কর্মকাণ্ডে কর্মযোগ নামক সাধন পথ প্রতিফলিত হয়েছে।
কর্মযোগের ধারণা: মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ঈশ্বর বা মোক্ষলাভ। ঋষিগণ এর জন্য কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তি—এই তিনটি সাধন পথের নির্দেশ দিয়েছেন। যা কিছু করা হয় তাই কর্ম। কর্ম দুই রকম—সকাম ও নিষ্কাম। বিশেষ ফলের আশায় কর্ম করলে তাকে সকাম কর্ম বলে; এতে কর্তৃত্বের অভিমান ও ফলাকাঙ্ক্ষা থাকে এবং এর ফলে বন্ধন হয়। আর কোনো ফলের আশা না করে কর্ম করাকে নিষ্কাম কর্ম বলে, যার ফল কর্মকর্তাকে স্পর্শ করে না। এই নিষ্কাম কর্মই যোগসাধনার ক্ষেত্রে কর্মযোগ। এখানে কর্মফল ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে হয়। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন' (২/৪৭)—কর্মেই তোমার অধিকার, ফলে কখনো নয়। নিষ্কাম কর্মে মোক্ষলাভ হয়।
উদ্দীপকের সঙ্গে সম্পর্ক: উদ্দীপকের সুকুমার বাবু সাংসারিক কাজের পাশাপাশি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। তিনি ফলের আশা না করেই সমস্ত কাজ করেন এবং কর্মফল ঈশ্বরের চরণে নিবেদন করেন। এ বৈশিষ্ট্য কর্মযোগের ফলাকাঙ্ক্ষাহীন কর্ম ও কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
সুতরাং, সুকুমার বাবুর কর্মকাণ্ডে কর্মযোগ সাধন পথই প্রতিফলিত হয়েছে।
- ঘ)
সুকোমল বাবুর কর্মকাণ্ড ভক্তিযোগের পরিচায়ক এবং পাঠ্যবইয়ের আলোকে বলা যায়, ভক্তিযোগের মাধ্যমে মোক্ষপ্রাপ্তি সম্ভব।
ভক্তিযোগের ধারণা: ভক্তিকে অবলম্বন করে যে ঈশ্বর আরাধনা, তাকে ভক্তিযোগ বলে। নারদীয় ভক্তিসূত্র অনুসারে ভগবানে ঐকান্তিক প্রেম বা ভালোবাসাই ভক্তি। গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের নামও ভক্তিযোগ। এই পথে সাধক সগুণ, সাকার ঈশ্বরের আরাধনা করেন।
১. সাকার উপাসনা ও ভগবদনুভূতি: ভক্তিযোগে সাধক ঈশ্বরকে সাকার ও গুণময়রূপে আরাধনা করেন। গীতায় বলা হয়েছে, অব্যক্ত ব্রহ্মচিন্তার চেয়ে সাকার ঈশ্বরের আরাধনা অপেক্ষাকৃত সহজ। উদ্দীপকে সুকোমল বাবু গৃহে শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপন করে সকাল-সন্ধ্যা ভক্তিভরে ডাকেন এবং সবকিছুর মধ্যে ভগবানকে অনুভব করেন। এটি ভক্তিযোগের সাধনারই বাস্তব রূপ।
২. গভীর বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ: ভক্তির মূলে থাকে গভীর বিশ্বাস—ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, করুণাময় ও ভক্তবাঞ্ছা-কল্পতরু। ভগবানকে একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করে তাঁর চরণে আত্মসমর্পণই ভক্তিযোগের সার কথা। সুকোমল বাবু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, ভগবান করুণা করলেই মুক্তি মিলবে। এই বিশ্বাস ও শরণাগতি ভক্তিযোগের প্রধান ভাব।
৩. ভগবানের অনুগ্রহ ও পাপমুক্তি: গীতায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ ত্যাগ করে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হন, তিনি ভগবৎভাব লাভ করেন এবং তাঁর পাপ-তাপ-দুঃখ থাকে না। ভক্তির মাধ্যমে ভক্ত ভগবানের অনুগ্রহ পান, আর ভগবানের অনুগ্রহই মোক্ষের পথ।
৪. যেকোনো পথেই মোক্ষলাভ সম্ভব: কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তি—এর যেকোনো একটি নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করলে সাধক মোক্ষ লাভ করতে পারেন। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্' (৪/১১)—যে আমাকে যেভাবে উপাসনা করে, আমি তাকে সেভাবেই তুষ্ট করি। অর্থাৎ মানুষ যে পথই অনুসরণ করুক, সব পথেই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো যায়। সুতরাং সুকুমার বাবুর কর্মযোগের মতো সুকোমল বাবুর ভক্তিযোগও মোক্ষের পথ।
অতএব, সুকোমল বাবু যদি নিষ্ঠা ও গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে ভক্তিযোগ অনুশীলন করে যান, তবে ভগবানের করুণায় তাঁর মোক্ষপ্রাপ্তি সম্ভব। কাজেই বক্তব্যটি যথার্থ।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও