বাংলা ২য় পত্র • Cumilla Board • কুমিল্লা বোর্ড ২০১৯

বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন

যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ লেখো:

12.1.

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আজকের বাংলাদেশ

12.2.

বাংলাদেশের কৃষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

12.3.

পোশাকশিল্প: সমস্যা ও সম্ভাবনা

12.4.

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ

12.5.

বই পড়ার আনন্দ

উত্তর ও ব্যাখ্যা

AI-তৈরি নমুনা উত্তর

১২.১. মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আজকের বাংলাদেশ

ভূমিকা:
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পেছনে কাজ করে নির্দিষ্ট কিছু আদর্শ ও আকাঙ্ক্ষা। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছিল একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্মিলিত অঙ্গীকার। বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এই চেতনা এক অনন্য পথপ্রদর্শক।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুরু হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বাংলার আপামর জনতা মরণপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিনিয়ে আনে লাল-সবুজের পতাকা।

মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা:
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা নিহিত ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্রে। এছাড়া ১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত চারটি মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র (শোষণহীন সমাজ), গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—হলো মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। অর্থাৎ এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অন্যায়ের কোনো স্থান থাকবে না।

আজকের বাংলাদেশ ও আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি:
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার করে আজকের বাংলাদেশ এক অপার সম্ভাবনার দেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা পাওয়া দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির প্রতীক। কৃষি, পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স), তথ্যপ্রযুক্তি এবং নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। নিজ অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বাস্তব প্রতিফলন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ:
আজকের বাংলাদেশ দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করলেও মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ‘সামাজিক সুবিচার ও বৈষম্যহীন সমাজ’ গঠনের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, বেকারত্ব এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার পরিপন্থি। তাছাড়া ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব:
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার মূল দায়িত্ব এই তরুণ প্রজন্মের। মেধা, সততা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতিহাস বিকৃতিরোধ করে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা এবং দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়াই আজকের তরুণদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

উপসংহার:
মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় অহংকার এবং আত্মপরিচয়ের ভিত্তিপ্রস্তর। আজকের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নপূরণের পথে অনেক দূর অগ্রসর হলেও চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে আমাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শকে ধারণ করে কাজ করলে আমরা একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে সক্ষম হব—যা-ই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা।

আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও

সম্পর্কিত প্রশ্ন