বাংলা ২য় পত্র • Rajshahi Board • রাজশাহী বোর্ড ২০২৫
বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন
5.
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ
উত্তর ও ব্যাখ্যা
AI-তৈরি নমুনা উত্তর
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ
ভূমিকা:
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং সবচেয়ে মারাত্মক ও উদ্বেগজনক সমস্যা হিসেবে পরিগণিত। সামগ্রিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক প্রতিবেশ ও মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই বৈশ্বিক সংকটে অন্যতম প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত বাংলাদেশ।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ:
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস) যথেচ্ছ ব্যবহার, ব্যাপক হারে বনভূমি ধ্বংস, যানবাহনের ধোঁয়া ইত্যাদি কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং ক্লোরোফ্লুরো কার্বনের (CFC) মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এই গ্যাসগুলো সূর্যের তাপকে প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যেতে বাধা দেয়, ফলে পৃথিবী ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরূপ প্রভাব:
উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া খরা, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব:
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব এ দেশের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে:
১. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল স্থায়ীভাবে নিমজ্জিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ১৭-২০% ভূমি পানির নিচে চলে যেতে পারে।
২. লবণাক্ততার বিস্তার: উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানি ও কৃষিজমিকে লবণাক্ত করে তুলছে। ফলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগের পৌনঃপুনিকতা: আইলা, সিডর, আম্পান, রেমালের মতো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা এবং পৌনঃপুনিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
৪. কৃষি ও অর্থনীতিতে ক্ষতি: অসময়ে বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ফসলহানি ঘটছে। নদীভাঙনে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ছে।
৫. জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বৃদ্ধি: পরিবেশগত সংকটের শিকার হয়ে প্রতি বছর উপকূল ও নদীভাঙন এলাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে, সৃষ্টি করছে নতুন সামাজিক সমস্যা।
উত্তরণের উপায় ও বাংলাদেশের পদক্ষেপ:
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিজস্ব অর্থায়নে 'বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড' গঠন করা হয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন, দুর্যোগ সহনশীল ঘরবাড়ি নির্মাণ ও কার্যকর দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে এককভাবে বাংলাদেশের পক্ষে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য উন্নত বিশ্বকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল ও প্রযুক্তি সহায়তা দিতে হবে।
উপসংহার:
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানবজাতি ও অর্থনীতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ, জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ন্যায্য অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অনাগত ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এক অপূরণীয় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও