বাংলা ২য় পত্র • Jashore Board • যশোর বোর্ড ২০২৩
বাংলা ২য় পত্র প্রশ্ন
প্রবন্ধ রচনা করো (যেকোনো একটি);
12.1.
ক. জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
12.2.
খ. কৃষিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও কৃষক
12.3.
গ. দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও তার প্রতিকার
12.4.
ঘ.আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ
12.5.
ঙ.বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প।
উত্তর ও ব্যাখ্যা
AI-তৈরি নমুনা উত্তর
ক. জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
ভূমিকা:
বাঙালি জাতির সহস্র বছরের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ড বা একটি নতুন পতাকার জন্ম দেয়নি, তা বাঙালি জাতিকে দিয়েছিল একটি নতুন দর্শন ও আত্মপরিচয়। সেই দর্শনই হলো 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'। জাতীয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এই চেতনা আমাদের পথপ্রদর্শক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরূপ:
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল শোষণ, বৈষম্য, পরাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তারই চূড়ান্ত পরিণতি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। সুতরাং সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাই হলো মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা।
সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা:
স্বাধীনতার পর প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন ঘটেছিল রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির মাধ্যমে—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র (শোষণমুক্ত সমাজ), গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই মূলনীতিগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মূল আকাঙ্ক্ষা।
জাতীয় জীবনে চেতনার প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয়তা:
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।
১. গণতন্ত্রের বিকাশ: মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অপরিহার্য।
২. অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমতা: একাত্তরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখা হয়েছিল। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং একটি দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়াই এই চেতনার মূল লক্ষ্য।
৩. অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন: মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মান্ধতা ও উগ্রবাদের মূলোৎপাটনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শই একমাত্র রক্ষাকবচ।
৪. দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন: মুক্তিযোদ্ধাদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে দেশকে দুর্নীতি, অনিয়ম ও শোষণমুক্ত করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
তরুণ প্রজন্ম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা:
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব হলো মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা এবং সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করা। একাত্তরের রণাঙ্গনে লড়াই করতে না পারলেও মেধা, সততা ও শ্রম দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে তরুণদের মুক্তিযুদ্ধ। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দেশকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোই হলো একাত্তরের চেতনার আধুনিক রূপায়ণ।
উপসংহার:
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার, আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিপ্রস্তর। কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা স্মৃতিরোমন্থনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; একে রূপান্তরিত করতে হবে কর্মে ও আচরণে। একটি সুখী, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন এবং আত্মমর্যাদাশীল 'সোনার বাংলা' গড়ে তোলার মাধ্যমেই শহীদদের রক্তঋণ শোধ করা সম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা একটি উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারি।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও